বাহরাইন ঘুরে: অহেতুক ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতাই বাহরাইন প্রবাসীদের অকাল মৃত্যুর অন্যতম কারণ বলে মনে করেন দেশটিতে বসবাসরত বাংলাদেশিদের অনেকে। একই অভিমত পারস্য উপসাগরীয় এই ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রে বাংলাদেশ দূতাবাসেরও।
সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাস্তা পারাপারে অসতর্কতার কারণে বাংলাদেশিরা যেমন দুর্ঘটনার শিকার হন, তেমনি গাদাগাদি করে থাকায় অগ্নিকাণ্ড বা অন্য কোনো দুর্ঘটনায় দলগত মৃত্যুর কবলে পড়েন।

বাহরাইনে কাজের চাপ ও দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর হার তাই বাংলাদেশিদেরই বেশি।
পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত খবর বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত সোয়া দুই বছরে অন্তত ৩৫ জন বাহরাইনপ্রবাসী বাংলাদেশি অপমৃত্যুর শিকার হয়েছেন।
এদের মধ্যে এক কমিউনিটি ফ্ল্যাটে অগ্নিকাণ্ডে ১৩ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়। উম আল হাসাম অঞ্চলে পিকআপ ও ট্রলারের সংঘর্ষে নিহত হন মোহাম্মদ রুবেল। জুফেরে একটি নির্মাণাধীন ভবনে কাজ করার সময় নিহত হন আলম মিয়া। হিদ শিল্প এলাকায় আল-কোবাইসি নামে একটি সিমেন্ট ও কংক্রিট মিক্সিং ফ্যাক্টরিতে দুর্ঘটনায় নিহত হন চাঁদপুরের বিল্লাল হোসেন মিয়া ও শরীয়তপুরের ইউনুস শিকদার। আদলিয়ায় নির্মাণাধীন ভবন থেকে পড়ে মারা যান নির্মাণশ্রমিক মজিদ।
রাজধানী মানামার এক বাড়িতে অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারান মোশাররফ হোসেন ও জালালসহ আরো এক বাংলাদেশি। উম আল হাসামে প্রাইভেটকার চাপায় মৃত্যু হয় আবুল বাশারের। মানামা থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে এক বাড়িতে বৈদ্যুতিক শর্ট-সার্কিট থেকে অগ্নিকাণ্ডে ১০ বাংলাদেশি শ্রমিক নিহত হন।



দূতাবাসের শ্রম কাউন্সেলর মহিদুল ইসলাম তাই বলেন, এখানে প্রতি মাসে গড়ে ৫ থেকে ১০ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়। বেশিরভাগই ন্যাচারাল ডেথ।
২০১৩ সালে ১০১ জন ও ২০১৪ সালে ৮৭ জন বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, বেশিরভাগ হার্ট অ্যাটাক। এখানকার বাংলাদেশিরা খাবার বেছে খায় না। তাই কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের কবলে পড়ে।
তবে দুর্ঘটনাজনিত অপমৃত্যুর বাস্তবতা স্বীকার করে মহিদুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশিরা রিস্কি জব (ঝুকিঁপূর্ণ কাজ) বেশি করে। অবৈধদের মধ্যে এই রিস্কি জব করার প্রবণতা বেশি। তারা সেফটি গিয়ার ব্যবহার করতে চায় না। হেলমেট ব্যবহার করতে চায় না। সেফটি বেল্ট ব্যবহার করতে চায় না। তাদের বক্তব্য, এগুলো নিয়ে নাকি কাজ করা যায় না। ইঞ্জিন রুমে ইয়ার লক ব্যবহার করতে চায় না। কানে নাকি তালা লেগে যায়। ওদের হাজার বলেও কাজ হয় না। আমরা



আহলি ইউনাইটেড ব্যাংক বাহরাইনের ডেপুটি ম্যানেজিং ডাইরেক্টর সাফকাত আনোয়ার বলেন, লো স্কিলড লেবাররাই বেশি দুর্ঘটনার শিকার হন। বাংলাদেশ থেকে অনেক আনস্কিলড লেবার এখানে আসেন। তাদের ইনকাম কমও। আবাসস্থল ভালো নয়। বাসস্থানের প্রপার মেইনটেন্যান্স নেই। একরুমে ১৫/১৬ জন থাকেন। আগুন লাগলে একসঙ্গে অনেকের মৃত্যু হয়।
তিনি বলেন, রাস্তা পারাপারে ডিসিপ্লিন না মানায় দুর্ঘটনায়ও বেশি পড়েন বাংলাদেশিরা। জেব্রা ক্রসিং মানেন না বলে পথচারী বাংলাদেশিরা দুর্ঘটনায় বেশি পড়েন।
ন্যাশনাল ফিশ ও প্যাসিফিক গ্রুপের এমডি শফি উদ্দিন বলেন, বাংলাদেশিরা অনেক খামখেয়ালি স্বভাবের হন। তাদের আবাসস্থলের পরিবেশ ভালো না। এমন পরিবেশ থেকে উত্তরণের জন্য দূতাবাস থেকে যদি বলা হয়, ১ হাজার টাকা বেশি দিয়ে থাকো- কেউ তা শুনবে না। এখানে সবাই সিসটেম ভালো বুঝে না, বুঝতেও চায় না।
লিন্নাস গ্রুপ চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদিন বলেন, সচেতনতার অভাবেই দুর্ঘটনায় মৃত্যু বেশি হয় বাংলাদেশিদের। বাংলাদেশিরা নিজেদের আবাসস্থলেরও পরিচর্যা ঠিকমতো করতে চায় না। রাস্তায় প্রায়শই অসতর্ক থাকে বলে দুর্ঘটনায়ও পড়ে বেশি।


বাংলাদেশ স্কুল অ্যান্ড কলেজ বাহরাইনের চেয়ারম্যান কেফায়েত উল্যাহ মোল্লা বলেন, দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি। কন্সট্রাকশন সাইটগুলোতে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘাট। মোটরসাইকেলে করে যারা হোম ডেলিভারির কাজ করেন তারাও দুর্ঘটনায় পড়েন।
বাহরাইন ফিন্যান্স কোম্পানির (বিএফসি) মার্কেটিং অ্যান্ড সেলস অফিসার মাজহারুল ইসলাম বাবু জানান, তারা অনেকে দুশ্চিন্তায় থাকেন। কেউ কেউ অনেক দিন ধরে দেশে ফিরতে পারেন না। চিন্তায় চিন্তায় হার্ট অ্যাটাক হয়। আর অ্যাক্সিডেন্ট তো আছেই।


টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ার নাসিম আহমেদ বলেন, বাংলাদেশিরা সেফটির (নিরাপত্তা) ব্যাপারে অজ্ঞ। আর এখানে অনেক বাংলাদেশি বাইসাইকেল চালান। এতে দুর্ঘটনা বেশি ঘটে। কনসট্রাকশন সাইটেও দুর্ঘটনা ঘটে।
বেসরকারি এক কোম্পানির বিক্রয় কর্মী মোহাম্মদ আইয়ুব বলেন, অনেক বাংলাদেশি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেন। যেমন- বিল্ডিং কনসট্রাকশন বা ওয়ার্কশপে কাজ করেন। আর এসব কাজে ঝুঁকি তো থাকেই।
বাহরাইন যুবলীগ সভাপতি এমএ করিম বলেন, বাংলাদেশিদের দুর্ঘটনা বেশি। অনেকেই মোটরসাইকেল চালিয়ে হোম ডেলিভারি দেন। এতে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেশি থাকে। তবে কেবল বাংলাদেশ নয়, ইন্ডিয়ার কেরালা ও অন্ধ্র প্রদেশের লোকজনও দুর্ঘটনায় পড়েন।
বাংলাদেশ সময়: ২২২০ ঘণ্টা, ফেব্রুয়ারি ২২, ২০১৫