ঢাকা, শনিবার, ১৫ চৈত্র ১৪৩১, ২৯ মার্চ ২০২৫, ২৮ রমজান ১৪৪৬

মুক্তমত

ওয়াসার পানিতে লবণাক্ততা, স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে নগরবাসী 

ডা. মো. মনজুরুল করিম বিপ্লব | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১২০৮ ঘণ্টা, মার্চ ২৬, ২০২৫
ওয়াসার পানিতে লবণাক্ততা, স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে নগরবাসী  ...

চট্টগ্রামে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিম্নগামী এবং সরবরাহকৃত পানিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধির সমস্যা বর্তমানে উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নেমে যাচ্ছে।

শহরের প্রতিটি এলাকার বাসা-বাড়ির  গভীর নলকূপ নতুন করে প্রায় ৩০-৪০ ফুট নিচে নামাতে হচ্ছে, তারপরও পানি পাওয়া যাচ্ছে না। উপজেলা পর্যায়ে প্রতি বছর প্রায় ২ ফুট করে এবং নগর এলাকায় প্রায় ৬ ফুট করে পানির স্তর নিচে নামছে।

অন্যদিকে কর্ণফুলী ও হালদা নদীর পানিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পেয়েছে। ওয়াসার তথ্য অনুযায়ী, নদীর পানিতে লবণের সহনীয় মাত্রা প্রতি লিটারে ২৫০ মিলিগ্রাম হলেও বর্তমানে তা ২,৫০০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত পৌঁছেছে। এ কারণে ওয়াসার পানি উৎপাদন দৈনিক প্রায় ৫ কোটি লিটার কমে গেছে, যা নগরবাসীর জন্য সুপেয় পানির সংকট সৃষ্টি করছে।  

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, নদী ও সাগরের পানি পরিশোধন করে ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি বন, পাহাড়, পুকুর, দিঘি খালগুলোর যত্ন নেওয়া অতীব প্রয়োজন। এছাড়া, ভূগর্ভস্থ পানির অপরিকল্পিত উত্তোলন নিয়ন্ত্রণে কার্যকর আইন তৈরি ও পদক্ষেপ গ্রহণ একান্ত জরুরি। লবণাক্ত পানির স্বাস্থ্যঝুঁকি বেশ গুরুতর হতে পারে, বিশেষ করে যদি দীর্ঘসময় ধরে লবণাক্ত পানি পান বা ব্যবহার করা হয় তা গণস্বাস্থ্যর জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে।

উচ্চ রক্তচাপ: লবণাক্ত পানিতে সোডিয়ামের পরিমাণ বেশি থাকায় এটি রক্তচাপ বাড়াতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, লবণাক্ত পানি পান করলে উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

কিডনি রোগ: অতিরিক্ত লবণ শরীরে পানিশূন্যতা সৃষ্টি করে, যা কিডনির ওপর বাড়তি চাপ ফেলে। দীর্ঘমেয়াদে কিডনির কার্যক্ষমতা কমতে পারে, এমনকি কিডনি বিকলও হতে পারে।

গর্ভবতী মায়েদের জটিলতা: গবেষণায় দেখা গেছে, লবণাক্ত পানি পান করলে গর্ভকালীন উচ্চ রক্তচাপ হতে পারে। এটি প্রি-এক্লাম্পসিয়া, অকাল প্রসব এবং কম ওজনের শিশুর জন্মের ঝুঁকি বাড়ায়।

পানিশূন্যতা ও ত্বকের সমস্যা: লবণাক্ত পানি বেশি পান করলে ডিহাইড্রেশন হতে পারে, যা ক্লান্তি, মাথা ঘোরা ও শারীরিক দুর্বলতা সৃষ্টি করে। এ পানি স্নানে দৈনন্দিন ব্যবহার করার ফলে ত্বকে চুলকানি, র‌্যাশ, এলার্জি ও ড্রাই স্কীন হয়ে ফাংগাল সমস্যা দেখা দিতে পারে, মেয়েদের অতিরিক্ত চুল পড়া ও মাথার ত্বকে সমস্যা হতে পারে।

ডায়রিয়া ও হজমের সমস্যা: অতিরিক্ত লবণ শরীরে পানির ভারসাম্য নষ্ট করে, ফলে ডায়রিয়া ও পেটের ব্যথা হতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে এটি মারাত্মক আকার নিতে পারে।

হাড়ের ক্ষতি: লবণাক্ত পানি দীর্ঘদিন পান করলে ক্যালসিয়াম বের হয়ে গিয়ে হাড় দুর্বল হয়ে পড়ে, যা অষ্টিওপেনিয়া ও অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি বাড়ায়।
আয়োডিনের ঘাটতি ও গলগণ্ড রোগ: অধিক লবণাক্ত পানি পান করলে থাইরয়েড হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে, যা গলগণ্ড বা থাইরয়েডের অন্যান্য সমস্যার কারণ হতে পারে।

প্রতিকার ও করণীয়:
- সুপেয় পানি ব্যবহারের ব্যবস্থা করা
- বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও ফিল্টার করা
- লবণাক্ত পানি পরিশোধনের জন্য রিভার্স অসমোসিস ফিল্টার ব্যবহার করা
- উচ্চ লবণাক্ততা থাকলে সেই পানি এড়িয়ে চলা

লবণাক্ত পানির গণস্বাস্থ্য ঝুঁকি কমাতে পদক্ষেপগুলো নেওয়া জরুরি।  
 

লেখক: চিকিৎসক, গবেষক ও পরিবেশ কর্মী

বাংলাদেশ সময়: ১২০০ ঘণ্টা, মার্চ ২৬, ২০২৫
এসি 

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।