“পুলিশ” আধুনিক রাষ্ট্র-যন্ত্রের একটি অপরিহার্য ও স্থায়ী অঙ্গ হিসেবে অবস্থান করে নিয়েছে। গত এক-দেড় শতাব্দীতে বিশ্বের অধিকাংশ দেশ তাদের ‘পুলিশিং’ ব্যবস্থা সুশৃঙ্খল ও জনগণের বন্ধু রূপে গড়ে তুলেছে।
বাংলা বানানরীতির শাশ্বত ধারাকে বাদ দিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই বাংলা বানান এমনভাবে লেখা হচ্ছে যা বিভ্রান্তিকর। আজও বাংলা বানান নিয়ে অনেক দোদুল্যমানতা রয়ে গিয়েছে যার নিরসন করা প্রয়োজন। এই ধরনের বানানের একটি উদাহরণ “পুলিশ”। রবি ঠাকুরের কাব্যগ্রন্থ ‘খাপছাড়া’তে ‘নিধু বলে আড় চোখে’ কবিতায় ইংরেজি ‘police’ শব্দের বানান ‘পুলিস’ লেখা হয়েছে----‘পুলিস যখন করে ঘরে এসে চড়োয়া’।
কবিতাটি প্রথম অংশটি এমন:
নিধু বলে আড়চোখে, "কুছ নেই পরোয়া। '—/স্ত্রী দিলে গলায় দড়ি বলে, "এটা ঘরোয়া। '/ দারোগাকে হেসে কয়, "খবরটা দিতে হয়'--/পুলিস যখন করে ঘরে এসে চড়োয়া। / বলে, "চরণের রেণু নাহি চাহিতেই পেনু। '--/এই ব'লে নিধিরাম করে পায়ে-ধরোয়া।

বিভিন্ন ধরনের নেতিবাচক ব্যাপারের সাথে বাংলায় লিখিত “পুলিশ” শব্দের অনুরণন দেখা যায়। যেমনঃ ‘মড়া খায় ইলিশে,/ ঘুষ খায় পুলিশে’ বা ‘মাছের রাজা ইলিশ,/ জামাইয়ের রাজা পুলিশ। ’ উপরন্তু বাংলা ‘পুলিশ’ শব্দকে ইংরেজি “Foolish” শব্দের সাথে মিলিয়েও চালু আছে নানা মুখরোচক কথাবার্তা। অথচ শব্দটির বানান “পুলিস” লিখলে তা অনেক সুন্দর এবং প্রাঞ্জল হতো।
প্রাসঙ্গিকভাবে যদি আমরা বাংলা একাডেমির প্রমিত বানান খেয়াল করি তাহলে দেখবো শ,ষ,স-এর ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত নিয়মের কথা বলা আছে:
“তৎসম শব্দে শ, ষ, স-য়ের নিয়ম মানতে হবে৷ এ-ছাড়া অন্য কোনো ক্ষেত্রে সংস্কৃতের ষত্ব-বিধি প্রযোজ্য হবে না৷ বিদেশী মূল শব্দে শ, স-য়ের যে প্রতিষঙ্গী বর্ণ বা ধ্বনি রয়েছে বাংলা বানানে তাই ব্যবহার করতে হবে৷ যেমন: সাল (বৎসর), সন, হিসাব, শহর, শরবত, শামিয়ানা, শখ, শৌখিন, মসলা, জিনিস, আপস, সাদা, পোশাক, বেহেশ্ ত, নাশতা, কিশমিশ, শরম, শয়তান, শার্ট, স্মার্ট৷ তবে, পুলিশ শব্দটি ব্যতিক্রমরূপে শ দিয়ে লেখা হবে৷”

তাছাড়া শব্দটি ইংরেজি “Police” শব্দ থেকেই যেহেতু এসেছে, এইক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী বানানরীতি চালু করে ভাষার স্বাভাবিকতা ঠিক রাখা হলো কীনা সে প্রশ্ন করাই যায়। ঢাকার বহুল প্রচলিত ইংরেজি ভুল বানান Dacca আমরা কয়েক দশক ব্যবহার ও লালন করেছি। অবশ্য পরে-- ১৯৮২ সালের পর-- বাংলা উচ্চারণের সাথে মিল রেখে ঢাকার ইংরেজি বানান আমরা Dhaka করেছি।
এছাড়া পুলিশের কোনো সদস্য কোনো অপকর্ম করলে সেই ক্ষেত্রে পুরো পুলিশকে দায়ী করে সংবাদপত্রে লেখার প্রবণতাও লক্ষ করা যায়। যেমন ‘শিক্ষককে লাঞ্ছিত করলো পুলিশ’। ‘তরুণীর শ্লীলতাহানি করলো পুলিশ’। মানে এখানে সমস্ত পুলিশ বাহিনীকেই প্রকারান্তরে যুক্ত করে ফেলা হলো। কিন্তু একই ধরনের আরেকটি শিরোনাম, ‘গাছে বেঁধে বউ পেটালেন সেনা সদস্য’। কিন্তু পুলিশ সদস্য বা কর্মী না লিখে এই ঘটনা পুলিশ সদস্য দ্বারা হলে বলা হতো ‘গাছে বেঁধে বউ পেটালো পুলিশ’। এই জাতীয় বৈপরিত্য কাম্য নয়। এই লেখার উদ্দেশ্য এই নয় যে, জনসাধারণ মনে করুক পুলিশ ফেরেস্তা অথবা শয়তান। বরং জনসাধারণ মনে করুক পুলিশ তাঁদের অংশ এবং মানুষ। এরাও ভুল করে, এরাও অপরাধে জড়ায়। এরা যাতে জনগণের সাথে সংগত ও কাম্য আচরণ করতে বাধ্য হয় সে-ব্যাপারে কার্যকরি পদক্ষেপ এবং যথাযথ আইন প্রণয়ন করাও জরুরি।

সর্বোপরি স্বাধীনতা লাভের এত বছর পরেও সময়োপযোগী বানানরীতি না থাকা ভাষাগবেষক, ভাষাপ্রেমী প্রত্যেকের কাছে পীড়াদায়ক। তাই বাংলা একাডেমির প্রমিত বানানরীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা যদি এই ব্যাপারে উদ্যোগী হন এবং একাডেমি থেকে প্রকাশিত অভিধানগুলোতে যদি ‘পুলিস’ বানান অন্তর্ভুক্ত করেন তাহলে জাতির মননে তা গেথে যাবে সহসাই। তাছাড়া পত্রিকাগুলোতেও এই বানান লিখিত হলে সহজেই এ নেতিবাচকতা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যেতো।

মোঃ আলমগীর হোসেন শিমুল: সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার হিসেবে বিমানবন্দর আর্মড পুলিশ, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, ঢাকায় কর্মরত।
বাংলাদেশ সময়: ১১২৪ ঘণ্টা, মে ৩১, ২০১৫
সম্পাদনা: জেএম