আগরতলা (ত্রিপুরা): রঞ্জিত দেববর্মার পর পুলিশের জালে আরও এক শীর্ষ সন্ত্রাসবাদী। শুক্রবার রাতে আচমকাই আত্মসমর্পণ করে নয়নবাসী জমাতিয়া।
নিজেকে ঘোষণা করেছিল স্বাধীন ত্রিপুরার প্রধানমন্ত্রী হিসাবে। শুক্রবার রাতে তেলিয়ামুরায় এসডিপিও চন্দন সাহার কাছে সে আত্মসমর্পণ করে। কিন্তু কোন অস্ত্র জমা দেয় নি।
প্রায় আড়াই দশক ত্রিপুরায় বিচ্ছিন্নতাবাদী কার্যকলাপের সাথে যুক্ত ছিল নয়নবাসী। বহু নিরপরাধ মানুষের রক্তের দাগ তার হাতে। খুন, জখম, অপহরণ, দাঙ্গা চালানোর মতো ঘৃণ্য কার্যকলাপে অভিযুক্ত সে।
দেশদ্রোহিতার মামলাও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ত্রিপুরা পুলিশ তার মাথার দাম ঘোষণা করেছিল এক লাখ টাকা। তার আত্মসমর্পণে অবাক সব মহল। পুলিশের দাবি জঙ্গি জীবনের প্রচন্ড ধকল আর নিতে পারছিল না নয়নবাসী।
তার চেহারায় আগের জেল্লাও নেই। হাতে গভীর ক্ষতের দাগ। বহুদিন পালিয়ে ছিল বাংলাদেশে। সেদেশের পুলিশের তাড়াও খেয়েছে বহুবার। তাছাড়া জঙ্গি দলগুলি এখন আর সেরকম টাকা তুলতে পারছে না মানুষের কাছ থেকে। যার কারনে অর্থ সংকটে ভুগছে জঙ্গি দলগুলি। সব মিলিয়ে আত্মসমর্পণ ছাড়া অন্য কোন পথ খোলা ছিল না তার কাছে।
শুক্রবার রাতে আত্মসমর্পণ করার আগে আরও দুইবার আত্মসমর্পণ করেছিল নয়নবাসী। এবার নিয়ে তিনবার আত্মসমর্পণ করল নয়নবাসী। কিন্তু আগের দুইবারই আত্মসমর্পণ করার পর সরকারের সঙ্গে পুনর্বাসন সংক্রান্ত বিরোধের জেরে নয়নবাসী ফের ফিরে গিয়েছিল জঙ্গলের জীবনে।
১৯৯৩ সালে প্রথম বার এটিটিএফ জঙ্গি হিসাবে আত্মসমর্পণ করেছিল সে। তারপর আবার ফিরে যায় জঙ্গি জীবনে। সেবার ফিরে গিয়ে গঠন করে এন এল এফ টি। তার সঙ্গে যৌথ নেতৃত্বে ছিল বিশ্বমোহন দেববর্মা, অনন্ত দেববর্মা, মন্টু কলই, জশোয়া দেববর্মা প্রমুখ।
কিন্তু এন এল এফ টি জঙ্গি দলে গোষ্ঠী দ্বন্দের কারনে নয়নবাসী গঠন করে তার নিজস্ব জঙ্গি দল। যার নাম দেয়া হয় এন এলে এফ টি (এন বি)। সেই জঙ্গি দলের সর্বাধিনায়ক ছিল নয়ন।
২০০৪ সালে সে সরকারের সঙ্গে সঙঘর্ষ বিরতি ঘোষণা করে। ঐ বছর এপ্রিল মাসে রাজভবনে তৎকালীন ত্রিপুরার রাজ্যপালের সঙ্গে দেখা করে আত্মসমর্পণের ইচ্ছা প্রকাশ করে। ঐ বছর ডিসেম্বর মাসে নিজের সঙ্গী সাথীদের নিয়ে ফিরে আসে স্বাভাবিক জীবনে।
রাজ্য সরকার এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে হয় পুনর্বাসন সংক্রান্ত ত্রিপক্ষীয় চুক্তি।
কিন্তু তার কিছু কিছু দাবি মেনে নেয়া সরকারের পক্ষে সম্ভব ছিল না। ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে তাকে ঘোষণা করার দাবি জানায় নয়নবাসী।
তাছাড়া আরও কিছু দাবির মধ্যে ছিল- ত্রিপুরার ৬০ সদস্য বিশিষ্ট বিধানসভায় ৫৭টি আসন উপজাতিদের জন্য সংরক্ষিত ঘোষণা করা, এডিসি’কে বরোল্যান্ডের মতো স্ট্যাটাস দেয়া।
কিন্তু এসব দাবি মেনে নেয়া সরকারের পক্ষে সম্ভব ছিল না। চুক্তির খেলাপ হচ্ছে এই অভিযোগ তুলে ফের নয়নবাসী জঙ্গলের পথে পা বাড়ায়।
এবার আত্মসমর্পণের পর নয়নবাসী সাংবাদিকদের শনিবার সকালে জানায়, ত্রিপুরার উন্নয়নে সেও শরিক হতে চায়। তাই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা। এদিন দুপুর বারটা নাগাদ তাকে আনা হয় আগরতলায়। এখানে এস বি (স্পেশাল ব্রাঞ্চ) সেলে তার জিজ্ঞাসাবাদ চলবে বলে জানা গেছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য পুলিশের একটি বিশেষ দলও গঠন করা হয়েছে বলে খবর।
এদিকে এস বি সেলের কর্মতর্কারা জানিয়েছেন তার শরীর খুব খারাপ। তাই আজ তাকে আদালতে নাও তোলা হতে পারে।
এ বছর জানুয়ারি মাসে পুলিশ আটক করেছিল রাজ্যের জঙ্গি দলের আরেক সন্ত্রাসী রঞ্জিত দেববর্মাকে। রঞ্জিতের পর নয়নবাসী। দুই নেতাই এখন পুলিশের কব্জায়। সবার ধারনা দীর্ঘ সাড়ে তিন দশক সন্ত্রাস ক্লান্ত ত্রিপুরায় সন্ত্রাসবাদ অস্তমিত হতে চলেছে।
বাংলাদেশ সময় : ১৪১৪ ঘণ্টা, আগস্ট ১০, ২০১৩
তন্ময়/সম্পাদনা: সুকুমার সরকার, আউটপুট এডিটর, কো-অর্ডিনেশন