২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর ইসলামী ছাত্রশিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন সাদিক কায়েম। পরে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় প্রকাশনা সম্পাদক পদে দায়িত্ব পান।
বাংলানিউজ: ছাত্রশিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি হিসেবে আপনি পরিচিতি পেয়েছেন। কিন্তু এর আগে এবং পরে আপনার রাজনৈতিক পথযাত্রা কী ছিল?
সাদিক কায়েম: আমি নবম শ্রেণি থেকেই ফ্যাসিবাদবিরোধী সব আন্দোলনে গিয়েছি। ২০১৩ সালে আমরা স্বপ্ন দেখেছিলাম, হাসিনার ফ্যাসিবাদকে ভেঙে দেশকে আজাদ করব। এরপর খাগড়াছড়ি থেকে আমি চট্টগ্রামে চলে আসি এবং ২০১৪-১৫ সালে রাজপথে ছিলাম। তখন আমার অনেক সাথীকে হারিয়েছি। আমার পাশের রুমের সাকিবের চোখ উপড়ে ফেলা হয়েছিল। অনেকে পঙ্গু হয়েছিল।
তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পর শুরুতে আমি হলে ছিলাম, সেসময় ছাত্রলীগ আমাকে জোর করে কয়েকটি প্রোগ্রামে নিয়ে গিয়েছিল। এই নষ্ট পরিবেশ আমাকে অনেক ট্রমাটাইজ করে ফেলে এবং আমি হল থেকে চলে যাই। তখন থেকেই আমরা এই দাসত্বের সংস্কৃতি মূলোৎপাটনের চিন্তা করি। ক্যাম্পাসে যেকোনো নির্যাতন-নিপীড়নের বিরুদ্ধে আমরা ছিলাম। কেউ নির্যাতনের শিকার হলে সাংবাদিকদের তথ্য দেওয়া থেকে শুরু করে থানায় যাওয়া পর্যন্ত সব কাজে জড়িত ছিলাম। আমরা ফ্যাসিবাদবিরোধী সবাইকে নিয়ে একটি সর্বদলীয় ঐক্যের কথা ভেবেছিলাম।
এরপর জুলাই অভ্যুত্থানে শুরু থেকেই ছিলাম। সবচেয়ে ক্রুশিয়াল সময়ে তথা ১৯ জুলাই থেকে ২ আগস্ট পর্যন্ত কর্মসূচি প্রণয়ন, নীতিনির্ধারণ, দেশি-বিদেশি অ্যাক্টিভিস্টদের সাথে সমন্বয় এবং সবার সাথে যোগাযোগের কাজ করেছি। মাঠেও সংগঠনের কাজ করেছি। শেখ হাসিনা পালানোর পর আমরা ফের জনতার কাতারে ফিরে আসি। বিভিন্ন সংস্কার প্রস্তাবনা দেওয়া, শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকা, জুলাইকে সাংস্কৃতিকভাবে প্রাসঙ্গিক রাখা, শহীদ ও আহতদের সাথে বিষয়গুলো দেখাসহ এরকম একাধিক কাজে যুক্ত ছিলাম।
বাংলানিউজ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখনো নানা সমস্যার জর্জরিত, এই বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আপনার ভিশন কী? এক বছরে বিশ্ববিদ্যালয়কে কোথায় দেখতে চান?
সাদিক কায়েম: নেতৃত্ব সংকট এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অযোগ্যতার কারণে সমস্যাগুলোর সমাধান হয়নি। যোগ্য নেতৃত্ব এলে স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদে এই সমস্যাগুলো সমাধান করা সম্ভব। পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা করা, ছাত্রীদের জন্য স্বল্পমেয়াদে হোস্টেল ভাড়া করা এবং দীর্ঘমেয়াদে হল নির্মাণ করা, গ্রন্থাগারের রিসোর্স অ্যাভেইলেবল করা এবং বিভিন্ন কনফারেন্স আয়োজন করা— সদিচ্ছা থাকলেই এগুলো সম্ভব। শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করা এবং গবেষণায় বাজেট বাড়ানোর কাজ করা প্রয়োজন। দেশের বাইরে অনেক কনফারেন্স হয়, সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যথাযথ প্রতিনিধিত্ব থাকে না। প্রশাসনিক ভবনকে ডিজিটালাইজ করা প্রয়োজন। এটা কোনো ব্যাপার নয়— চাইলেই সম্ভব।
বাংলানিউজ: নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণায় আপনারা কী কৌশল ব্যবহার করছেন?
সাদিক কায়েম: আমরা শিক্ষার্থীদের কথা শুনছি। তারা কেমন বিশ্ববিদ্যালয় চায়। দীর্ঘদিন যেহেতু তাদের সাথে ছিলাম, আমরাও জানি। এগুলোর ওপর আমরা আমাদের রূপরেখা নির্ণয়ের চেষ্টা করছি।
বাংলানিউজ: নির্বাচনের খরচ আপনারা কীভাবে বহন করছেন? আপনাদের আর্থিক উৎস কী?
সাদিক কায়েম: আমরা সকলে নিজেদের সংগঠনের জন্য কন্ট্রিবিউট করি। আমাদের সাবেক যারা দেশে-দেশের বাইরে আছে, তারা আমাদেরকে দেন। এছাড়া ছাত্রশিবিরের প্রায় ৩০০ রকমের প্রকাশনা আছে। সেখান থেকে আমাদের আয় হয়।
বাংলানিউজ: এ পর্যন্ত একাধিক নেতার বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। আপনারাও ছাত্রদলের প্রার্থীদের ব্যাপারে করেছেন, এরপরও বিষয়গুলোর সুরাহা হয়নি। এটিকে কীভাবে দেখছেন?
সাদিক কায়েম: এখানে আমরা অপপ্রয়াস দেখতে পাচ্ছি। তবে আমরা এটা প্রত্যাশা করছি না এবং শিক্ষার্থীরাও এটা গ্রহণ করছে না। ছাত্রদল হলগুলোয় কমিটি দিয়েছে। যেন ‘দিয়ে দিলাম, শিক্ষার্থীরা কী করবে?’ এমন। যারা ছাত্ররাজনীতি করি, তাদের কাছে ছাত্ররাই প্রধান। ছাত্ররা যে জিনিস চাচ্ছে না, তারা যেটা নিয়ে ট্রমার মধ্যে আছে, আমি কেন তাদের ওপর এটা চাপিয়ে দেব? আমরা প্রস্তাবনা দিয়েছি, বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউশনাল মেইলের মাধ্যমে ছাত্ররা কী ধরনের রাজনীতি চায়, তা আপনারা রূপরেখা দিন এবং তাদের মতামত ও পরামর্শ নিন। যে পরামর্শ সবচেয়ে বেশি আসে, তা গ্রহণ করুন। আমরা এসবের বাইরে শিক্ষার্থীদের জন্য রাজনীতি করব। আমাদের এখানে লেজুড়বৃত্তি চলবে না।
বাংলানিউজ: হলে তো আপনাদেরও কমিটি রয়েছে। কিন্তু আপনারা তা প্রকাশ করছেন না, এটি আপনাদের ভোটের মাঠে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে কী না?
সাদিক কায়েম: হলে কমিটি থেকে থাকলে আমাকে সে তালিকা দিন।
বাংলানিউজ: সেটি তো প্রকাশ্য নয়।
সাদিক কায়েম: কমিটির কোনো প্যাড আছে? এখানে কিছু ফরমালিটিজ আছে, যার মাধ্যমে একটি রাজনৈতিক দল পরিচালিত হয়। ফলে যেটি নেই, সেটি আপনি কিসের বিরুদ্ধে দায় দেবেন। তাছাড়া ওই কমিটি কি কাউকে প্রোগ্রামে নিয়ে যাওয়ার জন্য বাধ্য করেছে বা হলে কোনো প্রোগ্রামে হয়েছে?
বাংলানিউজ: ছাত্রশিবিরের বিজয় একাত্তর হলের দুই নেতার উদ্যোগে ক্রিকেট টুর্নামেন্ট আয়োজন হয়েছে। সেখানে সরাসরি অর্থায়ন করেছে ছাত্রশিবির?
সাদিক কায়েম: অর্থায়ন করতে পারে। রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে তো সবাই হলে থাকতে পারে। কিন্তু কমিটি দেওয়া মানে কী? পরের দিন আপনি ধীরে ধীরে প্রোগ্রামে নিয়ে যাবেন, আপনার অবস্থান তৈরি করবেন, সিট বণ্টন করবেন, প্রশাসনের ওপর প্রভাব বিস্তার করবেন, এভাবে আমরা তো এমন কমিটি করা বা আমাদের অ্যাক্টিভিজম নেই। কিন্তু সাংগঠনিকভাবে প্যাডে কমিটি দিয়ে যে রাজনীতি করার চর্চা, সেটি শিক্ষার্থীরা চাচ্ছে না। তারা চাইলে আমরা দেব। এর বাইরে রাজনৈতিক আদর্শ নিয়ে অন্যান্য দলের ছেলেদের মতো আমাদের ছেলেরাও আছে। কিন্তু শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া অপরাজনীতি।
বাংলানিউজ: আপনাদের বিরুদ্ধে একাধিক দল এ পর্যন্ত গুপ্ত রাজনীতির অভিযোগ করেছে। বিষয়টিকে কীভাবে দেখেন?
সাদিক কায়েম: আসলে গুপ্ত রাজনীতি করছে কে? ছাত্রদল আগে মিছিল করলে ১৫ জনও হতো না। এখন সেখানে ১৫০০ থেকে দুই হাজার লোক হয়। বাকি লোকগুলো কোথা থেকে এসেছে? কিছুদিন আগে জগন্নাথ হলে আমাদের বিরুদ্ধে একটি মিছিল হয়েছে। আমরা যে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্যানেলের কথা বলেছি, সেখানে আমরা সব ধরনের মানুষকে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছি। আমাদের এখানে সর্ব মিত্র চাকমা যখন এসেছে, তখন তারা মিছিল করছে। জগন্নাথ হলের সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে মিছিল করেছে। অথচ মিছিল পরিচালনা করছে জগন্নাথ হল ছাত্রদলের আহ্বায়ক। এছাড়াও বাম সংগঠনের ছিল। তাহলে গুপ্তদল কারা? করতে চাইলে ছাত্রদলের ব্যানারে করো। আজ আমাদের সাথে একটা ছেলে কাজ করছে, তারা তাকে ক্রমাগত হুমকি দিয়ে যাচ্ছে, এটি তো নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি হতে পারে না। নিজের ব্যানার বাদ দিয়ে অন্য ব্যানারে এসে তুমি নিজের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করবে, এটিই তো গুপ্ত রাজনীতি।
বাংলানিউজ: আপনাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, আপনারা নির্বাচিত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীদের অধিকার ক্ষুন্ণ হবে এবং তারা নানা ধরনের হ্যারাসমেন্টের শিকার হবেন। এটিকে কীভাবে দেখছেন? মাঠ পর্যায়ে কুশল বিনিময় করে আপনাদের কী মনে হয়েছে?
সাদিক কায়েম: আমাদের বিরুদ্ধে নারীদের ওপর হ্যারাসমেন্টের কথা বলা হয়। অথচ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলের সদস্য সচিব আরেফিন আমাদের প্রার্থীদের ব্যাপারে বিশ্রী ভাষায় বলেছে। সারাদেশে যে প্রোপাগান্ডা দেখি, বট বলা হয়। কিন্তু আপনি জরিপ করে দেখবেন, আমাদের বিরুদ্ধে কী পরিমাণ প্রোপাগান্ডা হচ্ছে এবং যত পেজ থেকে হচ্ছে, সব তাদের পন্থী। ক্রমাগত তাদের দায়িত্বশীল পর্যায় থেকেও করছে।
মাঠ পর্যায়ে ঘুরে আমরা দেখেছি, আমাদের নেতৃত্বগুণের ওপর নারীরা আস্থা রাখতে চায়। আমরা যখন নারী শিক্ষার্থীদের কাছে যাচ্ছি, তখন তারা আমাদেরকে নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছে। ফলে নারীরা আমাদেরকে ভালোভাবে গ্রহণ করছে না, এটি একটি প্রোপাগান্ডা। আমাদেরকে আদর্শিকভাবে মোকাবিলা করতে না পেরে প্রতিপক্ষরা মিথ্যা বিষোদগার করছে।
আমাদের বিরুদ্ধে আরেকটা প্রোপাগান্ডা হলো, ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের কাছে আমাদের গ্রহণযোগ্যতা নেই। অথচ তাদের কাছেও আমাদের গ্রহণযোগ্যতা ভালো। আমি নিজে ছোটবেলা থেকে বৈচিত্র্যের মধ্যে বেড়ে উঠেছি। সকাল থেকে আমাদের পাহাড়ি বন্ধু চাকমা-মারমা বন্ধুদের সাথে ফুটবল খেলেছি। ঈদে তারা আমাদের বাড়িতে আসত। বৈশাখীতে আমি তাদের বাড়িতে যেতাম। তাছাড়া আমরা যেসব ক্যাম্পাসে ছাত্রসংসদে ভালো করেছি, সব জায়গায় নারীদের ভোট বেশি পেয়েছি। তারা আমাদের ব্যক্তিত্বকে অনেক পছন্দ করে।
বাংলানিউজ: নির্বাচন স্বচ্ছ রাখার বিষয়ে আপনারা কোনো শঙ্কাবোধ করছেন কি না?
সাদিক কায়েম: নির্বাচন স্বচ্ছ রাখার জন্য এজেন্ট দেওয়া এবং প্রার্থীর নামের সাথে ছবি দেওয়ার কথা বলেছি। আমরা শঙ্কিত, যেহেতু শিক্ষকরা একটি দলের আদর্শ লালন করে। ফলে তারা একটি দলকে প্রাধান্য দিচ্ছে। একটি ছাত্র সংগঠন ক্রমাগত আচরণবিধি লঙ্ঘন করছে, সেগুলোর অভিযোগ গেলেও নির্বাচন কমিশন আমলে নিচ্ছে না। ফলে তাদের কার্যক্রমে যদি ওই ছাত্রসংগঠনকে সুবিধা দেয়, তখন ফলাফলও এদিক-ওদিক হতে পারে।
বাংলানিউজ: আপনি ছাত্রশিবির থেকে কীভাবে ভিপি পদের জন্য মনোনয়ন পেলেন এবং শিক্ষার্থীরা কেন আপনাকে ভিপি পদে নির্বাচিত করবেন?
সাদিক কায়েম: শিক্ষার্থীরা আমাদের যে নেতৃত্বগুণ, সততা, দক্ষতা, ঐক্য এবং জুলাই আন্দোলনে আমাদের ভূমিকা— বিশেষ করে ক্রুশিয়াল সময়ে সকলকে সাথে নিয়ে আন্দোলনের নীতি নির্ধারণ করা এবং জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী শহীদ ও আহতদের কাছে যাওয়া এবং এক বছর ধরে শিক্ষার্থীবান্ধব কাজ করা— এই সবকিছুতে শিক্ষার্থীরা আমাদের ওপর আস্থা রাখতে চায়। তারা আমাদের যোগ্যতার উপর আস্থা রাখতে চায়। আশা করছি, তারা আমাদের নির্বাচিত করবে। আমাদের দলের অভ্যন্তরে ভোটাভুটির মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচিত হয়। এবার অধিকাংশ পরামর্শ আমার পক্ষে এসেছে। সে কারণেই আমাকে ভিপি পদে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।
এফএইচ/এমজে