ঢাকা: শীতের পিঠা আর লোকগান আবহমান বাংলার হাজার বছরের ঐতিহ্য। আধুনিকতার ডামাঢোলে গা ভাসিয়ে দিলেও বাঙালি কী তা এত সহজে ভুলতে পারে?
এ যে শেকড়ের টান! নগরজীবনে বাস করলেও এর সিংহভাগই তো সেই Ôগাঁ-গেরামÕ থেকেই আমদানি।
Ôজাগো মানুষের সুপ্তশক্তি, হাটে-মাঠে-ঘাটে-বাঁকে’ এ শ্লোগানকে ধারণ করে ৩ দিনের এ পৌষ মেলার উদ্বোধন হয়েছে শুক্রবারের শিশির সিক্ত সকালে।
পৌষ মেলা উদযাপন পরিষদের ব্যানারে আয়োজিত এ উৎসবের সূচনা অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন উদযাপন পরিষদের সভাপতি সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব গোলাম কুদ্দুছ। আলোচনা পর্বে ঘোষণাপত্র পাঠ করেন উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বিশ্বজিৎ রায়। পৌষ কথন উপস্থাপন করেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক হাসান আরিফ।
শীতের সকালে দর্শনার্থীর সমাগম খুব বেশি না হলেও বিকেল গড়াতে না গড়াতেই দেখা গেলো বটমূল প্রাঙ্গণে তিল ধারণের ঠাঁই নেই।
বিকেল তিনটা থেকে শুরু হওয়া দিনের দ্বিতীয় পর্বের শুরুতে দলীয় সংগীত পরিবেশন করে, সরতীর্থ, আনন্দন, রবিরাগ, দৃষ্টি, ধ্রুব শিশুকিশোর সংগঠন। দলীয় নৃত্য পরিবেশন করে আচিক কালচারাল একাডেমি(গারো সম্প্রদায়) ও মানিকগঞ্জের মহুয়ার পালা ।
একে একে লালন সংগীত, বাউল সংগীত সহ লোকজ নানা গানে দর্শকদের দীর্ঘ সময় মাতিয়ে রাখেন, সমির বাউল, সুমনা দাস, সামিয়া নাজ, কানন বালা সরকার, শান্তা সরকার, তানিয়া মান্নান, আরিফ রহমানসহ আরো অনেকে।
আবৃত্তির মাধ্যমে দর্শকদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখেন ভাস্কর বন্দোপাধ্যায়, বেলায়েত হোসেন, রবি শংকর মৈত্রীসহ অন্যরা।
শেষ পর্যায়ে সমবেত দর্শকদের এক অন্য জগতে নিয়ে যায় ময়মনসিংহ গীতিকার চিরন্তন প্রেমের অমর উপাখ্যান মহুয়ার পালা। ব্যস্ত নগর জীবনের সবকিছু ভুলে কিছু সময়ের জন্য যেন সবাই হারিয়ে যান আবহমান বাংলায়!
সন্ধ্যায় বটমূল প্রাঙ্গনের এ পৌষ উৎসবে গিয়ে ৪০টি পিঠার দোকানের সবক’টিতেই দেখা যায় উপচে পড়া ভিড়। সপরিবারে অনেককেই এখানে দেখা গেছে লাইন দিয়ে পিঠা কিনতে।
ব্যস্ত নগর জীবনে দেশীয় ঐতিহ্যের খাবার পিঠাপুলির স্বাদ ভুলেই গিয়েছিলেন ব্যাংক কর্মকর্তা নাফিস ইফতেখার। জানালেন এ উৎসবে এসে আবার যেন সেই শৈশবেই ফিরে যেতে পেরেছেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘এখানে এসে শিশুকালের কথা মনে পড়ছে। আমার ছোট্ট ছেলেকেও নিয়ে এসেছি যাতে সে দেশীয় ঐতিহ্যের খাবার খেতে ও চিনতে পারে। কেননা একদিন হয়তো এসব হারিয়েই যাবে। ’
উৎসবের লাবণ্য নোয়াখালী পিঠাঘরের কামরুন্নাহার কাকলী বাংলানিউজকে জানান, ‘আমাদের দোকানে প্রায় ২০ রকমের পিঠা তৈরি করছি। এর সবই নোয়াখালী অঞ্চলে তৈরি হয়। এর মধ্যে রয়েছে, ডিম পাকর, সবজি পুরি, ইলিশ পুলি, সরভাজা, মালাই পুলি, ডিম চাপটি, চিতই পিঠা, ভাঁপা পিঠা ইত্যাদি। এতো চাহিদা যে বানিয়ে শেষ করতে পারছি না। ’
উৎসব আয়োজক কমিটির সভাপতি গোলাম কুদ্দুস পৌষ মেলা আয়োজনের নানা দিক তুলে ধরেন বাংলানিউজের কাছে। তিনি বলেন, ‘আমরা নগরে বাস করলেও আমাদের অধিকাংশের শেকড়ই গ্রামে। নগরের এ জনগোষ্ঠি গ্রামীণ জীবনের নানা সংস্কৃতি ও খাদ্যাভ্যাস থেকে বিচ্ছিন্ন আছি। আমাদের ছেলেমেয়েরা নানা ফাস্টফুডে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। ’
তিনি বলেন, ‘আমাদের নানী-দাদীরা যে কতটা শৈল্পিক সত্ত্বার অধিকারী ছিলেন-আমরা সেই ঐতিহ্যকেই ধারণ করতে চাই।
Ôবাংলাদেশের মানুষ যে অসাম্প্রদায়িক ও উৎসবপ্রিয় জাতি এসব মেলাই তা প্রমাণ করে। এসব উৎসব আমাদের জাতির ঐক্যের মেল বন্ধনকে আরো দৃঢ় করে। যারা সাম্প্রদায়িক মানসিকতা লালন করেন তাদের জন্য এ উৎসব এক ধরণের প্রতিবাদওÕ-যোগ করেন গোলাম কুদ্দুস।
তিনদিন ব্যাপী এ পৌষ উৎসবের দ্বিতীয় দিন শনিবার ও তৃতীয় দিন রোববারও শীতের পিঠাপুলির সঙ্গে অন্যান্য নানা আয়োজনও থাকছে রমনা বটমূল প্রাঙ্গণে।
বাংলাদেশ সময়: ২২১০ ঘণ্টা, জানুয়ারি ০৪, ২০১৩
এআই/সম্পাদনা: রাইসুল ইসলাম, নিউজরুম এডিটর