নিউইয়র্ক: যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ভবন উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় বাংলাদেশি তরুণ কাজী মোহাম্মদ রেজওয়ানুল আহসান নাফিসকে ৩০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন নিউইয়র্কের ফেডারেল আদালত। ফেডারেল চিফ জাস্টিস ক্যারল অ্যামন শুক্রবার স্থানীয় সময় সকালে (বাংলাদেশ সময় রাত নয়টা) এ দণ্ডাদেশ দেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ভবন উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগে এফবিআই ২০১২ সালের ১৭ অক্টোবর নাফিসকে গ্রেফতার করে। ১৬ নভেম্বর গ্র্যান্ড জুরি তাকে অভিযুক্ত করেন। এরপর প্রায় দশ মাস ধরে চলে নাফিসের বিরুদ্ধে দায়ের করা এ মামলা।
রায় ঘোষণার আগে তার কৃতকর্মের জন্য বারবার ক্ষমা প্রার্থনা করছিলেন বাংলাদেশ থেকে নিউইয়র্কে পড়তে যাওয়া নাফিস। তিনি তার বাবা-মা ও পরিবারের কাছে, তার নিজ দেশ বাংলাদেশ ও দেশের জনগণের কাছে, নিউইয়র্কের জনগণের কাছে এবং আমেরিকার জনগণের কাছে ক্ষমা চান।
আমি আমার কৃতকর্মের জন্য দুঃখিত, লজ্জিত এবং ক্ষমাপ্রার্থী- বিষন্ন ও কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলছিলেন এই তরুণ।
নাফিস বলেন, আমি আমার বাবা-মায়ের হৃদয় ভেঙে দিয়েছি। তাদের কাছে আমার অপরাধের শেষ নেই। তারপরও তারা যেন আমাকে ক্ষমা করে দেন। নিউইয়র্ক ও আমেরিকার জনগণের কাছেও ক্ষমা প্রার্থনা করছি। ক্ষমা চাইছি আমার দেশবাসী বাংলাদেশের জনগণের কাছেও।
রাষ্ট্রীয় খরচে নিযুক্ত নাফিসের মার্কিন আইনজীবী হেইডি সিজার অবশ্য নাফিসকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছিলেন আদালতের কাছে। তার ভাষ্য ছিল, এ মেয়াদের কারাদণ্ড হলে সাজা শেষে নতুন করে জীবনে প্রবেশ করতে পারতেন ২২ বছর বয়সী এই তরুণ। তিনি কিছু একটা করে বেঁচে থাকতে পারতেন।
কিন্তু আদালত এই আইনজীবীর আবেদন না শুনে আইন অনুসারে ৩০ বছরের কারাদণ্ড দেন নাফিসকে।
নাফিসের বাবা-মা যুক্তরাষ্ট্রে এসে তাদের সন্তানের সঙ্গে দেখা করতে পারবেন কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে আইনজীবী হেইডি সিজার বাংলানিউজকে বলেন, বাংলাদেশস্থ যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস ট্যুরিস্ট ভিসায় তাদের এদেশে আসতে অনুমতি দিলে তারা তা করতে পারবেন।
এর আগে গত ৩০ মে নাফিসের বিরুদ্ধে মামলার রায় দেওয়ার কথা থাকলেও তা পিছিয়ে ৯ আগস্ট ঘোষণা করেন আদালত। চিফ জাস্টিস ক্যারল অ্যামন রায় ঘোষণার নতুন তারিখ দিয়ে পরবর্তী ছয় সপ্তাহের মধ্যে নাফিসের ফরেনসিক ও সাইক্রিয়াটিক রিপোর্ট পর্যালোচনা করার নির্দেশ দেন।
নাফিসের আইনজীবী হেইডি সিজার ও যুক্তরাষ্ট্র সরকারের প্রসিকিউটর রিচার্ড টাকার আদালতে শুনানি করেন।
তবে সংশ্লিষ্ট অনেকেরই ধারণা ছিল, নাফিসকে অপেক্ষাকৃত লঘুদণ্ড দেওয়া হতে পারে। আদালতে দোষ স্বীকার করে নেওয়ার কারণেই এ লঘুদণ্ডের প্রত্যাশা ছিল তাদের। গত ৭ ফেব্রুয়ারি আদালতের কাছে দোষ স্বীকার করে নেন নাফিস। অবশ্য এর আগে ১০ জানুয়ারি নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছিলেন তিনি।
সর্বশেষ রায়ের আগে গত ৩১ জুলাই বিচারক ক্যারল অ্যামনের কাছে চিঠি লিখে অনুকম্পাও প্রার্থনা করেছিলেন নাফিস। পাঁচ পৃষ্ঠার ওই চিঠিতে নাফিস জানান, তোতলামি, প্রেমিকার প্রতারণা, আমেরিকান শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বের করে দেওয়াসহ বিভিন্ন কারণে প্রচণ্ড মানসিক যন্ত্রণা ও নিঃসঙ্গতায় ভুগছিলেন তিনি। যেহেতু ইসলাম ধর্মে আত্মহত্যা নিষিদ্ধ, তাই আর কোনো উপায় না দেখে ‘জিহাদের’ মাধ্যমে নিজেকে শেষ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। এভাবেই ফেডারেল রিজার্ভ ভবনে হামলার পরিকল্পনা করেন নাফিস। তবে পরিকল্পনার সময় থেকেই তাকে অনুসরণ করে এফবিআই।
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, যুক্তরাষ্ট্র সরকার নাফিসের কাছে দু’টি প্রস্তাব দিয়েছিলো। একটি, দোষ স্বীকার করে নিলে সাজার মাত্রা কমানো, আর অন্যটি হচ্ছে পূর্ণাঙ্গ শুনানি। যাতে দোষী হলে সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে। পরে দোষ স্বীকার করে নেন নাফিস।
২০১২ সালের জানুয়ারিতে স্টুডেন্ট ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে আসার পর দক্ষিণ-পূর্ব মিসৌরির একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন নাফিস। সাইবার সিকিউরিটি বিষয়ক ওই কোর্স শেষ না করেই জুনের শেষ সপ্তাহে নিউইয়র্কের একটি টেকনিক্যাল কলেজে ভর্তি হন তিনি।
নাফিসের মনোভাব বুঝতে পেরে এফবিআই তাকে বিস্ফোরণ ঘটানোর কাজে প্ররোচিত করে। তারা তাকে নকল বিস্ফোরক সরবরাহ করে। এফবিআই’র ওই পরিকল্পিত প্ররোচনায় সাড়া দিয়ে ২০১২ সালের ১৭ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ভবন উড়িয়ে দিতে বিস্ফোরক নিয়ে সেখানে যান নাফিস। পরে হামলার আগে নকল বিস্ফোরকসহ এফবিআই তাকে গ্রেফতার করে। ওই ঘটনায় নাফিসের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।
এদিকে, নাফিস গ্রেফতার হওয়ার পর থেকেই ঢাকায় তার পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তিনি ষড়যন্ত্রের শিকার। নিউইয়র্কেও কমিউনিটির অনেকে মনে করেন, নাফিস ষড়যন্ত্রের শিকার।
বাংলাদেশ সময়: ২১২০ ঘণ্টা, আগস্ট ০৯, ২০১৩
এমএমকে/ সম্পাদনা: অশোকেশ রায়, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর- eic@banglanews24.com