নয়াদিল্লি: পাকিস্তানে চলমান সেনা-সরকার উত্তেজনার চূড়ান্ত ফলাফল কী দাঁড়াতে পারে তা নিয়ে জল্পনা কল্পনা চলছে। সম্ভাব্য ঘটনার মধ্যে সবচে এগিয়ে রয়েছে, সরকার পতন, আগাম নির্বাচন।
গত ২ মে অ্যাবোটাবাদে মার্কিন অভিযানে আল কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেন নিহত হওয়ার পর থেকে সরকারের সামরিক বাহিনীর দ্বন্দ্ব অনেকটা প্রকাশ্যে চলে আসে। তারই জেরে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সহায়তা চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্রেসিডেন্ট জারদারির পক্ষে ওয়াশিংটনে নিযুক্ত পাক রাষ্ট্রদূত হোসেইন হাক্কানির স্মারকলিপি দেওয়ার ঘটনা ফাঁস হলে এই দ্বন্দ্ব চরমে পৌঁছে।
হাক্কানিকে সরানো হলো, সরকার-সেনাবাহিনী বৈঠক হলো তবে পরস্পর বিরোধী বিবৃতি কিন্তু থামেনি। এই উত্তেজনায় সর্বশেষ সংযুক্তি হলো প্রতিরক্ষা সচিব লেফটেন্যান্ট জেনারেল নাঈম খালিদ লোদিকে প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানির আকস্মিক বরখাস্ত।
এখন জানা যাচ্ছে, প্রধানমন্ত্রীর এই আচমকা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে গেছেন লোদি। আর সেনা কর্মকর্তারাও বলছেন নুতন সচিব নার্গিসকে তারা মানবে না।
এদিকে এর মধ্যে চিকিৎসার নাম করে প্রেসিডেন্ট জারদারি গেছেন দুবাই। ইমরান খান এর আগেই বলেছেন, জারদারির দেশে থাকার প্রয়োজন নেই।
এইসব কিছু মিলিয়ে এখন সবচে বড় প্রশ্ন হলো, পাকিস্তানে আসলে কোন পথে হাঁটছে? এর সম্ভাব্য একটা উত্তর হতে পারে সাবেক সেনা শাসক জেনারেল পারভেজ মোশররফকে আবার পাকিস্তানের মসনদে বসানোর প্রচেষ্টা। ইন্ডিয়ান ডিফেন্স রিভিউয়ের দৃষ্টিতে অন্তত সেরকমই মনে হয়েছে।
যুক্তিটা হলো- এরকম ঘটার সম্ভাবনার সঙ্গে পরিস্কার যোগযোগ পাওয়া যাচ্ছে গত কয়েক মাসের ঘটনায়। যেমন আসন্ন ২০১২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মোশাররফের লড়বার ঘোষণা, সঙ্গে রাখতে চান সদ্য রাজনীতির মাঠ গরম করা উদীয়মান নেতা ইমরান খান। আর সঙ্গে পাক সামরকি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই তো রয়েছেই।
পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হওয়ার খায়েশে পূর্ব পরিকল্পনা অনুয়ায়ী মোশাররফ আন্তর্জাতিক সমর্থন লাভের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বিরতিহীনভাবে।
তিনি পাকিস্তানের নির্বাচনে জিততে চান সেনা বাহিনীর সমর্থন নিয়েই। বিষয়টা এখন মোটেও অসম্ভব মনে হবে না। কারণ বেসামরিক সরকারের সঙ্গে সামরিক বাহিনীর দ্বন্দ্ব চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। যে কোনও মূহূর্তে ছোট খাটো অভ্যুত্থান ঘটে যাওয়া অসম্ভব নয়। আর পাকিস্তানের রাজনীতির ইতিহাসে এটা বিরল কোনও ঘটনাও নয়।
সম্প্রতি জনগণের সঙ্গে গলা মিলিয়ে জনস্বার্থ নিয়ে কথা বলার কারণে তেহরিক-ই-ইনসাফের নেতা ইমরান খান ব্যাপক সাড়া ফেলে দিয়েছেন। বড় বড় সমাবেশ আর র্যালি করেছেন। কিন্তু জানা যাচ্ছে, এসব সমাবেশ-র্যালির সংগঠক নাকি আইএসআই এবং পাক সেনা বাহিনী।
সুতরাং বলাই যায়, সেনা সমর্থনে আগামী নির্বাচনে ইমরান জিততে পারেন আর তিনিই হবেন পাকিস্তানের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী।
এই কৌশল এখন অনেকটা উন্মোচিত। এর মানে হলো- এখন মোশাররফ, কায়ানি, ইমরান খান এবং সেনা বাহিনী আর এদের সঙ্গে রয়েছে দেশটির জিহাদি গোষ্ঠীগুলো, এরা সবাই এখন একই মঞ্চে।
এমনকি স্মারকলিপি কেলেঙ্কারিতে জড়িত রাষ্ট্রদূত হাক্কানিকে ওয়াশিংটন থেকে দেশে ডেকে পাঠানোর প্রক্রিয়াটিও কিন্তু আইএসআই’র পাতানো। আর এর পেছনে কলাকাঠি নেড়েছেন জেনারেল কায়ানি।
বিন লাদেন এবং জঙ্গি গোষ্ঠীর সঙ্গে আইএসআইয়ের সম্পর্ক- এসব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানি সেনা বাহিনীর সম্পর্ক আপাত দৃষ্টিতে কিছুটা অবনতির দিকে বলেই মনে হচ্ছে। বিষয়টি হয়ত সেনা বাহিনী ভালভাবে উপলব্ধিও করেছে। তাই সম্প্রতি চীন সফর করেছেন সেনা প্রধান কায়ানি। সফরে যে তার পরিকল্পার পক্ষে বেইজিংকে হাত করেছেন তা ধারণা করাই যায়।
এখন একটা ‘মৃদু অভ্যুত্থান’র পরিষ্কার সম্ভাবনা রয়েছে। যেখানে প্রেসিডেন্ট জারদারি এবং তার সহযোগীরা পদ্যতাগ করবেন এবং দ্রুত নির্বাচন দেওয়ার জন্য বাধ্য করা হতে পারে। অথবা একটি ‘প্রবল অভ্যুত্থান’ও হতে পারে যাতে সরাসরি পাক সেনা বাহিনী সামনে চলে আসবে এবং দেশে মার্শাল ল জারি করবে।
মোশাররফ দেশে ফিরলে তাকে গ্রেপ্তারের হুমকি দিয়েছেন পাক প্রধানমন্ত্রী গিলানি। কিন্তু খুব সম্ভব পাক আর্মি এটা করতে দেবে না।
সুতরাং পাকিস্তানের এখন সবচে সম্ভাব্য যে ঘটনা তা হলো, সরকার পরিবর্তন এবং তা সেনা সমর্থিত হবে তার সম্ভাবনাই প্রবল।
বাংলাদেশ সময়: ১৭০৪ ঘণ্টা, জানুয়ারি ১২, ২০১২