ঢাকা: স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি না থাকার কারণে মব ভায়োলেন্স হচ্ছে বলে উল্লেখ করেছেন স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের চেয়ারম্যান ও স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. তোফায়েল আহমেদ।
শনিবার (৩০ আগস্ট) জাতীয় প্রেসক্লাবের মাওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁ হলে সেন্টার ফর ইনক্লুসিভ পলিসি অ্যান্ড গভর্নেন্স (সিআইপিজি) এর উদ্যোগে রাষ্ট্র সংস্কার ও জুলাই সনদ: বর্তমান প্রেক্ষিত শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান আলোচকের বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
সিআইপিজির চেয়ারম্যান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. মো. মোজাম্মেল হক ওই অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন। সঞ্চালনা করেন সাবেক সচিব ড. মো. শরিফুল আলম।
অনুষ্ঠানে কি-নোট উপস্থাপন করে বক্তব্য রাখেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. নজরুল ইসলাম ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এ কে এম ওয়ারিসুল করিম।
বৈঠকে প্যানেল আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন সাবেক সচিব মু. আবদুল কাইয়ূম, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাসান নাসির, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক মাসুমুর রহমান খলিলী, এসএফ আহমেদ অ্যান্ড কোম্পানির সিনিয়র পার্টনার প্রখ্যাত চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট মো. এনামুল হক চৌধুরী, অতিরিক্ত সচিব (অব.) ও জাতিসংঘ জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. ফজলে রাব্বি সাদিক আহমেদ।
অধ্যাপক ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, যে সংস্কার প্রস্তাবগুলোতে রাজনৈতিক দলগুলো একমত হয়েছে সেগুলো আগামী দুই মাসের মধ্যে বাস্তবায়ন করতে হবে। আর যেগুলোতে একমত হয়নি সেগুলো নিয়ে আলোচনা চলমান রাখতে হবে।
তিনি আরও বলেন, প্রবাসীরা পাসপোর্ট ও জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যগত ভুলগুলো শোধরাতে পারবে না। সরকার পাসপোর্টের তথ্যের ভিত্তিতে প্রবাসীদের ভোটার লিস্ট ও পোস্টাল ব্যালট করতে পারে। কেউ চাইলে সরাসরি ভোট দিতে পারবে অথবা পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে তারা অগ্রিম ভোট দিতে পারবে। বর্তমান আইন অনুযায়ী দেশের ভেতরেও পোস্টাল ব্যালট উন্মুক্ত করলে সবাই ভোট দিতে পারবে, এতে ভোটের সংখ্যা ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের চেয়ারম্যান বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের উপকারভোগী গোষ্ঠীগুলো প্রতিবিপ্লবের বিষয়ে সচেতন নয়। যে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে তা যদি অবহেলায় হারিয়ে ফেলি তাহলে স্বৈরাচার আবার ফিরে আসবে। তাই রাষ্ট্রীয় সংস্কার করতে হবে। শুধু ভোট আয়োজন করাই সংস্কার নয়। বৃহত্তর স্বার্থে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। বিশেষত জামায়াত বিএনপির ঐক্য ধরে রাখতে হবে। ইসলামী ও মধ্যপন্তি দলগুলোর ঐক্য মজবুত করতে হবে। বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সামাল দিতে হচ্ছে এ অনির্বাচিত সরকারকে। তাই সবাইকে সাবধানে কথা ও কাজ করতে হবে।
এ স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ বলেন, আনুপাতিক পদ্ধতিতে ভোটের অনেক সুবিধা আছে। এ পদ্ধতিতে ভোট হলে সবার ভোট গণনা হয়। সবার ভোটের গুরুত্ব পায়। তবে এ পদ্ধতিতে কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় না। তাই সরকার স্বৈরাচারী হতে পারে না। বর্তমান বাস্তবতায় দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা করতে হবে। পিআর হবে, না একক সংখ্যাগরিষ্ঠ পদ্ধতিতে হবে তা রাজনৈতিক দলগুলো আলোচনার মাধ্যমে ঠিক করবে।
তিনি আরও বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন আগে হওয়া উচিত ছিল। স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি না থাকার কারণে মব ভায়োলেন্স হচ্ছে। স্থানীয় নির্বাচন একক সংখ্যাগরিষ্ঠ পদ্ধতি ও জাতীয় পার্লামেন্ট নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য উপযোগী যেকোন পিআর পদ্ধতিতে হতে পারে।
অন্যান্য বক্তারা দৃশ্যমান বিচার নিশ্চিত করা, নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার, প্রবাসী ভোটারদের ভোটদান নিশ্চিত করা, ফ্যাসিবাদী প্রশাসন ব্যবস্থা সরিয়ে নিরপেক্ষ, দক্ষ প্রশাসনের অধীনে নির্বাচন নিশ্চিত করার উপর গুরুত্বারুপ করে তাদের স্ব স্ব বক্তব্য উপস্থাপন করে।
এছাড়াও তারা বাংলাদেশের উপযোগী আংশিক আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক পদ্ধতিতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ওপর গুরুত্বারুপ করেন এবং পিপিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে সব রাজনৈতিক দলের ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা হতে পারে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
অধ্যাপক ড. মো: নজরুল ইসলাম বলেন, জুলাই বিপ্লব ছিল অরাজনৈতিক বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন যাতে আপামর সব শ্রেণি পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করেন। তাই জুলাই যে আকাঙ্ক্ষায় সংগঠিত হয়েছিল তা এ সনদে উল্লেখ থাকতে হবে।
অধ্যাপক ড. এ কে এম ওয়ারিসুল করিম বলেন, বর্তমান একক সংখ্যাগরিষ্ঠ নির্বাচন পদ্ধতিতে ম্যান্ডেটের ক্রাসিস থাকে। ১৫১টি দেশে কোনো না কোনোভাবে আনুপাতিক নির্বাচন ব্যবস্থা প্রচলিত আছে। বর্তমান পদ্ধতির মতোই পিআর পদ্ধতিতেই ভোট হতে পারে যেখানে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ পদ্ধতিতে ৩০০ আসনে নির্বাচন হবে এবং ৩০০ আসনের জন্য আনুপাতিক পদ্ধতি প্রয়োগ করা যেতে পারে।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাসান নাসির বলেন, অন্তবর্তী সরকার দৃশ্যমান বিচার ও সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিলেও তা জনগণ দেখতে পারছে না। এখন ১/১১ এর আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে।
সাবেক সচিব মু. আবদুল কাইয়ূম বলেন, সনদ না সংবিধান এ বিতর্ক তোলা হচ্ছে। সনদের আলোকেই সংবিধান রচনা করতে হবে এবং তা বাস্তবায়নের জন্য যেসমস্ত প্রতিষ্ঠান কাজ করবে তাদেরকে সংস্কার করতে হবে। স্বৈরাচারের রেখে যাওয়া প্রশাসন দিয়ে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। প্রশাসনিক সংস্কার করতে হবে।
এ অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন মো. এনামুল হক চৌধুরী। তিনি বলেন, এমপিদের মূল কাজ আইন প্রণয়ন করা। আইনপ্রণেতারা এলাকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনায় সম্পৃক্ত থাকেন বিধায় আমাদের নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস হয়েছে। তাই আমাদেরকে আইনপ্রণতাদেরকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড হতে বিরত রাখতে হবে।
দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক মাসুমুর রহমান খলিলী বলেন, জুলাই সনদের যদি আইনি ভিত্তি না থাকে তাহলে এ সনদের কোনো গুরুত্ব থাকবে না। জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছাই হলো সাংবিধানিক ভিত্তি।
আরকেআর/জেএইচ